Home » বইয়ের বিকল্প শুধুই বই; রাজীব সরকার

বইয়ের বিকল্প শুধুই বই; রাজীব সরকার

by প্রিয় দেশ ডেস্ক:

মহামারি করোনার থাবায় বিশ্বব্যাপী জীবনযাত্রা নানাভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। বাংলাদেশেও স্বভাবত এর ঢেউ লেগেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প খাতসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। এ নিয়ে গণমাধ্যমে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে অনালোচিত রয়ে গেছে প্রকাশনা শিল্পের ক্ষতি।

এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য শিক্ষিত নাগরিকদের ভূমিকা জরুরি। ‘বইকেনা’ প্রবন্ধে সৈয়দ মুজতবা আলী এক ড্রয়িংরুম-বিহারিণীর গল্প বলেছিলেন। তাকে কোনো উপলক্ষে বইকেনার উপদেশ দেওয়া হলে তিনি বলেছিলেন, এটিও একটি তার বাসায় আছে। একটি বই থাকাকেই তিনি যথেষ্ট মনে করেছিলেন। এত বছরেও পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে বলে মনে হয় না। এ যুগের একটি গল্প শুনলেই সেটি স্পষ্ট হবে। এক ধনী ঠিকাদার একটি সুরম্য অট্টালিকা নির্মাণের পর বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করেছেন। সবাই বাড়ির স্থাপত্য ও আসবাবপত্রের প্রশংসা করছেন। এক বন্ধু বললেন, এতকিছুর মধ্যে বইয়ের অভাব ভালো লাগছে না। বাড়িতে একটি লাইব্রেরি থাকলে ভালো হতো। করিৎকর্মা ঠিকাদারের জবাবও কোনো ব্যাপার নয়। আজই আমি দশ টন বইয়ের অর্ডার দিচ্ছি।

বই নিয়ে বিখ্যাত ব্যক্তিদের অমর উক্তির অভাব নেই। আমরাও কারণে-অকারণে তা উদ্ধৃত করতে ভুল করি না; কিন্তু বইকে অন্তর থেকে ভালোবাসি ক’জন? একটি বিয়ের অনুষ্ঠান কল্পনা করা যাক। বিপুল অর্থব্যয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে অতিথিরা দামি উপহার নিয়ে আসছেন। টিভি, ফ্রিজ, ডিনারসেট থেকে শুরু করে প্রাইজবন্ড অর্থাৎ টাকাও কেউ কেউ উপহার দেন। যদি কোনো অতিথি মহামূল্যবান উপহার বই নিয়ে এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন, সবাই বাঁকা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাবেন। উপহারদাতা বিব্রত হবেন, গ্রহীতা অসন্তুষ্ট হবেন। এভাবেই মহামূল্যবান উপহার বই অনাদরে কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

পুরস্কার পেতে সবাই ভালোবাসেন। বিভিন্ন উপলক্ষে প্রতি বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে লাখ লাখ শিক্ষার্থী পুরস্কার পান। এসব পুরস্কারের সিংহভাগ জুড়ে আছে ক্রেস্ট আর ক্রোকারিজ। দ্রুত এসব ক্রেস্ট ধূলির স্তূপে মলিন হয়ে যায়। ক্রোকারিজও একসময় জীর্ণ হয়ে পড়ে। অথচ শিক্ষার্থীদের জন্য অমূল্য পুরস্কার হতে পারে বই। বাংলাদেশে এমন একটি শিক্ষিত পরিবার পাওয়া যাবে না, যে পরিবারে ডিনারসেট, স্যুপসেট, কাপ, পেল্গট, চামচ নেই। কিন্তু এমন পরিবার পাওয়া কঠিন হবে না, যে পরিবারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্ধারিত পাঠ্যসূচির বাইরে অন্য বইয়ের পাঠাভ্যাস নেই, কদর নেই। ক্রোকারিজের বদলে শিক্ষার্থীদের হাতে যদি পুরস্কার হিসেবে বই তুলে দেওয়া হয়, তাতে লাভ ছাড়া কোনো ক্ষতি নেই। যদি দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুরস্কার হিসেবে বইকে অগ্রাধিকার দেয় তবে প্রতিটি পরিবারে ধীরে ধীরে একটি লাইব্রেরি গড়ে উঠবে এবং বইয়ের বিপণন বাড়বে। বইয়ের পাঠক কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতিকে দায়ী করেন অনেকে। কিন্তু এ অগ্রগতির পীঠস্থান ইউরোপ-আমেরিকায় কি বইয়ের পাঠক কমেছে? এক বছর ইউরোপে বসবাস করার সুবাদে দেখেছি বাসে, ট্রামে, ট্রেনে, প্লেনে অধিকাংশ যাত্রী বই বা কোনো ম্যাগাজিন নিয়ে মগ্ন।

সহযাত্রীর সঙ্গে আলাপ, আড্ডা, চিৎকার বা বাগ্‌বিতণ্ডা অনুপস্থিত উন্নত দেশগুলোর গণপরিবহনে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির নির্যাসটুকু রাজহাঁসের মতো পানি থেকে দুধ ছেঁকে নেওয়ার পদ্ধতিতে আহরণ করছে তারা। এজন্য পাঠাভ্যাস বিসর্জন দিতে হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে-বিদেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও উগ্রবাদের কারণে অনেক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। সমাজবিশ্নেষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। কিন্তু এটি স্পষ্ট- সহনশীল, উদার ও মানবিক সমাজ গঠন ছাড়া এ ধরনের হিংস্র ঘটনা প্রতিরোধ করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে বইয়ের ভূমিকা অত্যন্ত মূল্যবান। সভ্যতা ও মূল্যবোধ বিকাশে বইয়ের গুরুত্ব অপরিহার্য।

বৈষয়িক স্বার্থসিদ্ধিকে লক্ষ্য করেই আমাদের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রম সাজানো হয়। এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মত্ত নতুন প্রজন্ম। ‘বিনাযুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’র মতো দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করতে থাকা শিক্ষার্থীদের যদি মানবিক মূল্যবোধ ও পরস্পরের প্রতি সহযোগিতামূলক মনোভাবের মধ্য দিয়ে বড় করতে হয়, তবে তাদের পাঠাভ্যাসকে অবারিত করতে হবে।

বইকে জনপ্রিয় ও আদরণীয় করে তুলতে হবে। শুধু সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দিকে না তাকিয়ে প্রকাশক, বিক্রেতা, প্রতিষ্ঠানপ্রধান, অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী- সবাই মিলে এ কাজ করা প্রয়োজন। ক্রেতাদের অনেকের অভিযোগ, বইয়ের দাম বেশি বলে তারা বই কিনতে পারেন না। আর তারা বই কেনেন না বলে বই সস্তা করা যায় না। এই অচ্ছেদ্য চক্র সম্পর্কে সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছেন, ‘এ চক্র ছিন্ন তো করতেই হবে। করবে কে? প্রকাশক না ক্রেতা? প্রকাশকের পক্ষে করা কঠিন, কারণ ওই দিয়ে পেটের ভাত জোগাড় করে। সে ঝুঁকিটা নিতে নারাজ। এক্সপেরিমেন্ট করতে নারাজ- দেউলে হওয়ার ভয়ে। কিন্তু বই কিনে কেউ তো কখনও দেউলে হয়নি। বই কেনার বাজেট যদি আপনি তিন গুণও বাড়িয়ে দেন, তবু তো আপনার দেউলে হওয়ার সম্ভাবনা নেই।’

সভ্যতার অগ্রগতি ও বইয়ের অস্তিত্ব অবিচ্ছেদ্য। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগেও ছাপা বইয়ের গুরুত্ব সামান্যতম হ্রাস পায়নি। ব্যক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বই পড়া ও বই কেনায় উৎসাহিত করা উচিত। পুরস্কার ও উপহার হিসেবে যদি বইয়ের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা যায়; এ দেশের প্রকাশনা শিল্প যেমন শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াবে, তেমনি জাতি হিসেবে আমাদের সাংস্কৃতিক মান আরও উঁচু হবে। সভ্যতার এক অদ্বিতীয় বাহক বই।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক।


এই বিভাগের আরো খবর

Leave a Comment