Home » ফাগুনের জন্মদিন এবং

ফাগুনের জন্মদিন এবং

by প্রিয় দেশ ডেস্ক:

কাকন রেজা: ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছিলো ফাগুনের খুব প্রিয় সিনেমা। হিন্দি সিনেমার প্রতি ফাগুনের বরাবরের বিতৃষ্ণা সত্বেও ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছিলো ব্যতিক্রম। ওর সাথে বসে কতবার ছবিটি দেখেছি আমি। ফাগুন রেজা’র কথা বলছি। এই প্রজন্মের অতি মেধাবী একজন গণমাধ্যমকর্মী। যাকে হত্যা করা হয়েছিলো। যার হতভাগ্য বাবা আমি।

ভাগ্যের কথায় বলি। দুর্বলের এক অসহায় অজুহাত হচ্ছে ভাগ্য। করোনা আক্রান্ত হলো কেন, ভাগ্য। টিকা পেলো না কেন, ভাগ্য। অক্সিজেন নাই কেন, ভাগ্য। আইসিইউ নেই কেন, ভাগ্য। দুর্ঘটনা ঘটলো কেন, ভাগ্য। ধর্ষিতা হলো কেন, ভাগ্য। মারা গেলো কেন, ভাগ্য। সব আমাদের ভাগ্য। আমাদের মূলত ভাগ্য ছাড়া আর কাউকে দোষারোপ করার সাহস নেই। থাকলেও তা কেড়ে নেয়া হয়েছে।

যাকগে ফাগুনের কথায় আসি, ‘থ্রি ইডিয়টস’ প্রসঙ্গে। ফাগুনের মূলত পড়াশোনাটাই ছিলো প্রধান, ডিগ্রিটা নয়। ওর যে বিষয় ছিলো তার বাইরেও তাবৎ বিষয়ে জানা চাই ওর। ওর রুমমেট ছিলো আইনের ছাত্র। সেই রুমমেটের ভাষ্য অনুযায়ী, ফাগুন আইনটা তার থেকেও ভালো জানতো। রুমমেটের প্রশ্ন ছিলো, ‘তোর তো বিষয় আইন না, তুই আইন পড়িস কেন?’ ফাগুনের সোজাসাপ্টা উত্তর, ‘ভালো লাগে’। হ্যা, ফাগুনের জানতে ভালো লাগতো, পড়তে ভালো লাগতো। আমার উইকিপিডিয়া ছিলো ফাগুন। কোনো কিছু জানতে চাইলে ফাগুনকে লাগতো। কী জানতে, পড়তে ভালো লাগতো না ওর। ও যেদিন সকাল বেলা বেড়িয়ে যায়, তখনও পড়ছিলো। পলাশীর ইতিহাসের বিশেষ একটা দিক নিয়ে ছিলো সেই পড়া। বইয়ের পাতা মুড়িয়ে রেখেই ও বেড়িয়ে গিয়েছিলো। এখনো পাতাটি মোড়ানোই আছে। হয়তো পাতাটির প্রতীক্ষা, ফাগুন ফিরবে, আবার শুরু করবে পড়া।

‘থ্রি ইডিয়টস’ এর আমির খানের চরিত্রটাও তাই। জানার জন্য পড়া, ডিগ্রির জন্য নয়। জানাটাই কাজে লাগে, ডিগ্রিটা মূলত প্রদর্শনবাদীতা। ফাগুন অনার্সে থাকতে যা করতে পেরেছে, অনেকের নামের আগে ডক্টরেট ডিগ্রি লাগানো আছে, তাদের পক্ষেও তা পারা সম্ভব নয়। ফাগুনের সামনে এমন দু’একজন ড. পদবীধারীর নাকাল অবস্থা দেখেছি আমি।

আগেও লিখেছি, ফাগুনের এইচএসসি’র ইংরেজি পরীক্ষা নিয়ে। পরের দিন ইংরেজি পরীক্ষা, দেখলাম মনিটরে পড়ছে। ও বই নয়, বেশিরভাগ পড়াশোনা সারতো মনিটরে। দেখলাম, মনিটরে ইংরেজি বিষয়ের কিছু একটা পড়ছে। ভাবলাম, পরীক্ষার পড়া। কিন্তু কাছে যেতেই চক্ষু চড়কগাছ। ফাগুনের মনিটরে খোলা গ্রিক মিথোলজি’র একটা চ্যাপ্টার। বললাম, কাল ইংরেজি পরীক্ষা তুই পড়ছিস গ্রিক মিথোলজি। হেসে বললো, ‘এটা তো ইংরেজিই।’ জানালো, পরীক্ষার জন্য ইংরেজিটা না পড়লেও চলবে। ও কে চিনি, তাই কিছু বললাম না। আর ছোট থেকে বড় হয়েছে, কখনো বলার প্রয়োজন হয়নি, বোধ করিনি।

আজ সেই ফাগুনের, ফাগুন রেজা’র জন্মদিন। ইহসান ইবনে রেজা, ফাগুন রেজা পঁচিশে পড়বে এবার। ও থাকলে, আজ হয়তো দুজনে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম। তার আগে রাতের প্রথম প্রহরে পরিবারের সবাই মিলে কেক কাটা হতো। সন্ধ্যায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে যেত ফাগুন। বন্ধুরা মিলে জন্মদিন সেলিব্রেট করতো। তবে সব আয়োজনই সাধাসিধে, ‘হাউকাউ’য়ের বাইরে। জন্মদিনের নামে, উৎসবের উছিলায় আড়ম্বরতা তথা ‘হাউকাউ’ ফাগুনের অপছন্দ ছিলো। ‘হাউকাউ’টা ফাগুনেরই ভাষা। এভাবেই অহেতুক আড়ম্বরতাকে সম্বোধন করতো ও।

আজ আমার দিনটা কাটবে কী করে? ওর চলে যাবার পর এটা হলো তৃতীয় জন্মদিন। ফাগুন ছাড়া ফাগুনের জন্মদিন। অদ্ভুত না। একজন বাবা হিসেবে নিজেকে কেউ আমার জায়গায় চিন্তা করে দেখুন তো। চিন্তা করার সাহসটাই হবে না আপনাদের। কিন্তু আমি, ফাগুনের না থাকা জন্মদিনটাতেও একজন বাবা হিসেবে থাকি। পৃথিবীতে এই থাকার চেয়ে বড় কষ্টের আর কি কিছু আছে?

ফাগুনের জন্মের কথা বলেছি তো আগের অনেক লেখায়। আবার বলছি। ফাগুনের দাদা, যাকে ফাগুন ডাকতো দাদুবাবা। আমার আব্বু। ফাগুন যেদিন জন্ম নিলো দেড়মন মিষ্টি বিলিয়ে ছিলেন আশেপাশের মানুষদের। আমার মা, মামনি আর আমি হাউমাউ করে কেঁদেছিলাম অসম্ভব আনন্দে। বুঝতে পারিনি সেই কান্নাটাই সারাজীবনের জন্য স্থায়ী হতে চলেছে আমার। শুধু আনন্দের জায়গাটা দখল করতে যাচ্ছে ভয়ংকর এক যাতনা।

ফাগুন চলে যাবার দুই বছরের বেশি হয়ে গেলো। কিন্তু তার হত্যা রহস্যের উদঘাটন এখনো হলো না। এখনো জানা গেলো না, কারা ছিলো এর পেছনে। কী কারণে ফাগুনকে হত্যা করা হলো। শুধু কিলার গ্রুপটাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। দু’জন গ্রেপ্তারও আছে, একজন স্বীকারোক্তি দিয়েছে। কিন্তু সেই স্বীকারোক্তিও একজন প্রফেশনাল কিলারের বয়ান। যে বয়ানে কৌশলে অনেক কিছুই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। যাতে সহজে মূল জায়গায় পৌঁছা না যায়।

তারপরেও ফাগুনের জন্মদিনে বলি, হাল ছাড়িনি আমি। ফাগুন হত্যার বিচার একদিন না একদিন হবেই, হতে হবে। সৃষ্টিকর্তা বলেন কিংবা প্রকৃতি, কোনো কিছুই সে বিনা দণ্ডে যেতে দেয় না। এমন অপরাধেও বিনা দণ্ডে পার পাবে না অপরাধীরা, পাওয়া উচিত নয়। পেলে ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের বিশ্বাস উঠে যাবে। বিশ্বাস না থাকলে সৃষ্টিকর্তা বলেন আর প্রকৃতি সবই মিথ্যা।

লেখক : সাংবাদিক, কলাম লেখক ও নিহত সাংবাদিক ফাগুন রেজার বাবা

 

*প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব


এই বিভাগের আরো খবর

Leave a Comment