Home » মনোরোগ, মনের রোগ

মনোরোগ, মনের রোগ

by প্রিয় দেশ ডেস্ক:

কাকন রেজা: কথা হচ্ছিলো এক ছায়াসঙ্গীর সাথে, মনোরোগ বিষয়ে। বন্ধু বলি না, বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে এ বয়সে অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়। সম্পর্কের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক হলো বন্ধুত্বের। সে জন্যই ভার্চ্যুয়াল সম্পর্ককে আমি আখ্যা দিই ‘ছায়াসঙ্গী’ নামে। ছায়াই তো।

কথা হচ্ছিলো মনোরোগের ধরণ নিয়ে। আমার এক পরিচিতজন আছেন যিনি মনোরোগের চিকিৎসক। লোকে যাকে পাগলের ডাক্তার বলেন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলার অভিজ্ঞতা খুব সুখকর হয় না। হুমায়ূন আহমেদও তাই বলেছিলেন। আমার পরিচিত যে মনোরোগের চিকিৎসকের কথা বললাম, সে সব মানুষের মধ্যেই একজন পাগল দেখতে পান। এক সময় ব্যাপারটি হাস্যকর মনে হতো। আমিও তাকে মাঝেমধ্যে বিভ্রান্ত করতাম। মানুষকে বিভ্রান্ত করা খুব কঠিন কাজ নয়। সাধারণ মানুষের চেয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের বিভ্রান্ত করা সম্ভবত আরো সহজ। কারণ তারা বিভ্রান্ত হবার জন্য তৈরি হয়ে থাকেন।

যে কথা বলছিলাম। ওই যে সবাইকে পাগল ভাবার বিষয়ে। প্রথমে ব্যাপারটি হাস্যকর মনে হলেও, পরে ভেবে দেখেছি, সুস্থতা একটা প্রাথমিক ধারণা। সুস্থ মানে হলো আমরা প্রকাশ্যে যা করছি এবং তা স্বাভাবিক ভাবে। কিন্তু অপ্রকাশ্যে? প্রশ্নটা ওখানেই। প্রতিটা মানুষের মধ্যে দুটি সত্তা থাকে। একটি প্রকাশ্য, আরেকটি অপ্রকাশ্য। প্রকাশ্যটা হয়তো স্বাভাবিক থাকে, কিন্তু অপ্রকাশ্যে প্রতিটি মানুষই অস্বাভাবিক। যখন প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যের মাঝের ব্যারিয়ারটা উঠে যায়, তখনই লজিক হারায় মানুষ। ঠাহর করতে পারে না বাস্তবতা আর জাদু বাস্তবতার পার্থক্যটাকে। লজিক হারানোটাই মনোরোগের জটিলতর পর্যায়।

জাদু বাস্তবতার কথা বলি, সাহিত্যে যা বহুল চর্চিত। মানুষের চিন্তাতেও একটা ফ্যান্টাসি থাকে। থাকে নিজস্ব ফ্যান্টাসি কিংডম। যে লাজুক পুরুষটি, একজন নারীর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে ইতস্তত করেন, সেও তার কিংডমে ওই নারীটিকেই সম্ভোগ করেন। যে সম্ভোগ কখনো ধর্ষকামে রূপ নেয়। অথচ তিনি প্রকাশ্যে নিপাট ভদ্রলোক। নারীর ক্ষেত্রেও একই কথা। যিনি অফিসে, বাসায় বা রাস্তায় হেনস্তা হয়েও প্রকাশ্যে চুপ থাকেন, অপ্রকাশ্যে সেই হেনস্তার বিরুদ্ধে হয়ে উঠেন প্রতিশোধ প্রবণ। এমনটা প্রায় সবার ক্ষেত্রেই ঘটে। এমনকি শোবার ঘরের মানুষটিও বাথরুমে গিয়ে আলাদা মানুষ হয়ে যান। এই যে আলাদা মানুষ হওয়ার ব্যাপারটি, এটা কি স্বাভাবিক? না। অর্থাৎ অপ্রকাশ্য মানুষটি, আমার ভেতরের আমিটি স্বাভাবিক নই। অপ্রকাশ্য মানুষটি প্রকাশ্যে এলে মনোরোগের ব্যাপারটিও প্রকাশ্যে আসে।
মনোরোগের আরেকটি প্রকাশ্য অংশ রয়েছ। যাকে চিকিৎসার ভাষায় বলে ‘মুড ডিসর্ডার’। অর্থাৎ আবেগিক অসামঞ্জস্যতা। হঠাৎ আবেগের পরিবর্তন। সহসা বিষন্ন হয়ে যাওয়া, রাগ করা, উত্তেজিত হয়ে উঠা। এসব মুড ডিসর্ডার। এটাও অপ্রকাশ্য মানুষটিকে ক্রমশ প্রকাশ্যে আনার একটা ধাপ। অবশ্য অনেকে ‘ঢপ’ দেন। বিশেষ করে প্রেমিক-প্রেমিকারা এই ‘ঢপে’র ব্যবহার বেশি করেন। এটা হলো মনোযোগ আকর্ষণের প্রক্রিয়া। কিন্তু এটাও রোগের প্রাথমিক ধাপ। এই যে ‘ঢপ’ বা ধোকা দিয়ে অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করা, এর রুটটা সম্ভবত শৈশবে। শৈশবের কোনো না পাওয়া থেকেই, আকর্ষণের এই চেষ্টাটা অবচেতনে তৈরি হয়। অর্থাৎ অপ্রকাশ্যে থাকে, প্রয়োজনের সময় প্রকাশ্যে এসে যায়। বেশির ভাগ প্রেমিক-প্রেমিকারা এই ‘ঢপ’ রোগের শিকার।

‘ঢপ’ রোগীদের একটা কমন বিষয় থাকে। তা হলো ক্রমশ বিশ্লেষণের ক্ষমতা হারানো। তারা ‘ঢপ’ দিতে দিতে কী কারণে বিপরীত পক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছেন তাই ভুলে যান। অর্থাৎ সব কিছু যা সমন্বয় করে, স্মৃতি-মেধা-মনন সেই বোধ হারাতে থাকেন। তাদের কাছে সব বাদ দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণটাই মূল হয়ে দাঁড়ায়। মুশকিল এইখানেই। তখন প্রেম লাটে উঠে, সংসার গোল্লায় যায়। ব্রেকআপ এবং ডিভোর্স সঙ্গতই প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। হালে এই ‘ঢপ’ উপসর্গ বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্রেকআপ এবং ডিভোর্স বাড়ছে।

আবেগ বিষয়ক আরেকটা ঝামেলায় পড়েন সোকল্ড ইন্টেলেকচুয়্যালরা। মানে নিজে নিজে বুদ্ধিমান ভাবা মানুষরা। তারা বিভিন্ন বিষয়ে নিজেকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করেন। আমার এক পরিচিত জন আছেন, যিনি চিনি ছাড়া চা খান বহুমূত্র এড়াবেন বলে। কিন্তু এক লিটার কোক এক বসাতেই গলায় ঢালেন। তার যুক্তি হলো, চা তো বারবার খাই, কিন্তু কোক তো দিনে একবার। বোঝেন, নয় চামচ চিনি থাকে এক লিটার কোকে। অবস্থা এই আর কী। সোকল্ড ইন্টেলেকচুয়্যালরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সামলাতে গিয়ে বেসামাল হয়ে যান। এটাকে আপনি ‘প্রবলেমস ইন পারসেপশন’ও বলতে পারেন। সোজা কথায় বিভ্রান্তি।

আমার এক প্রিয়জনও এখন এই বিভ্রান্তিতে আছেন। তার সমস্যাটা বলি। তার একজনকে ভালো লাগে। ভালোলাগাটাকে তিনি পাত্তা দিতে চান না। তার ধারণা তিনি যথেষ্ট শক্ত মানুষ, এটা কোনো ব্যাপার না। ওই যে ‘বুদ্ধিমান’। কিছুটা পড়াশোনাও আছে মনোবিজ্ঞানের উপর। সুতরাং তিনি ‘সব বোঝেন’ টাইপ মানুষ। মুশকিল হলো, যে ভালোলাগাটাকে তিনি পাত্তা দিতে চাচ্ছেন না, তা তার মাথার ভেতর পোকা হয়ে ঢুকে থাকে, খোঁচায়। তিনি আরেক মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান, সেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বুদ্ধি দেন ‘ইগনোর’ করতে। তিনিও করেন। এভাবেই চলছে।

একদিন হয়তো তার সে ভালোলাগার মানুষটি ধৈর্য হারাবে। সেই বুদ্ধিমান ভাববেন, এই তো পেরেছি। অথচ তার এই পারা, তার ভেতর যে দ্বন্দ্বের তৈরি করবে বা করেছে, সে দ্বন্দ্ব একসময় তাকে সত্যিকার অর্থেই মানসিকভাবে অসুস্থ করে দেবে। কারণ তার এই আত্মবিশ্বাস এক সময় অভ্যাসে পরিণত হবে। ভালোবাসার অনুভূতিটাই নষ্ট হয়ে যাবে। দেহজীবীদের মানসিক অবস্থা যেমন হয়। তারাও না বুঝে এই উপেক্ষার প্র্যাকটিস করে। শরীরকে পণ্য, আর মনকে অভ্যস্ত করে তোলে। কাহিনি একটাই। ‘অবসেশন’ও বলতে পারেন। বুদ্ধিমানরা মনে করেন তারা বুঝে করছেন, আর দেহজীবীরা না বুঝে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কথা বলছিলাম। আমাদের মতন দেশে মনোবিজ্ঞান কেউ শখ করে পড়তে গেছেন এমন ঘটনা কম। উপায় নেই বলেই পড়তে যাওয়া। আমাদের দেশের সামাজিক পরিস্থিতিতে ‘পাগলের ডাক্তার’ সহজে কেউ হতে চান না। যারা হন, তাদের বেশিরভাগই উপায়হীন হয়েই হন। পড়াশোনা ব্যাপারটা আনন্দের। জানার জন্য ইচ্ছে প্রয়োজন, বাধ্যতা নয়। যখন ইচ্ছের জায়গায় চাপিয়ে দেয়া হয়, আনন্দের জায়গায় উপায়হীনতা আসে তখন সেই পড়াশোনা ব্যর্থ হয়। যারা আমির খানের সিনেমা ‘থ্রি ইডিয়টস’ দেখেছেন তারা বিষয়টি সহজেই বুঝতে পারবেন।

আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার ‘পাগলের ডাক্তার’দের অবস্থা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাই। উপায়হীনদের পড়াশোনা মানে মুখস্ত বিদ্যা। আর মুখস্ত বিদ্যা কোনো কাজের কথা নয়। যার ফলে তাদের ভুলভাল হয় বেশি। অনেকে পাগল থেকে পাগলের ডাক্তারদের ভয় পান বেশি। নাটক-উপন্যাসে পাগলের ডাক্তার মানেই আউলা মানুষ। হুমায়ূন আহমেদ খুব ভালো বলতে পারতেন এ বিষয়ে। তিনি গুরুদেব মানুষ।

লেখক : সাংবদিক ও কলামিস্ট


এই বিভাগের আরো খবর

Leave a Comment