Home » মূল্যবোধের অবক্ষয় সর্বময়

মূল্যবোধের অবক্ষয় সর্বময়

by প্রিয় দেশ ডেস্ক:

তালাত মাহমুদ : 

ভুল করে ক্ষমা চাওয়ার মতো মহৎ কাজ আর নেই। ক্ষমা চাওয়ার মাঝে সংঘর্ষের সম্ভাবনা থাকেনা। বরং মধুর সম্পর্ক অটুট থাকে। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা ও বিশ্বাস আরো বেড়ে যায়। বৃহৎ পরিসরে ভুল স্বীকার বা ক্ষমা চাওয়ার ফলে পৃথিবীও বিগ্রহমুক্ত হয়। যারা বুদ্ধিমান, যারা সংবেদনশীল মনের অধিকারী, যাদের মাঝে মানবিক মুল্যবোধ রয়েছে তারা প্রিয়জন, প্রতিবেশী আর আত্মীয়স্বজন নিয়ে অনাবিল পরিবেশে সুখ-শান্তিতে বসবাস করতে চায়। তারা ভুল করে বুঝতে পেরে ক্ষমা চাইতে কালবিলম্ব করেনা। কারণ তারা জানে, দোষে-গুণেই মানুষ। তারা জানে, মিথ্যাচার, জিঘাংসা, প্রতিহিংসা, মান-অভিমান ধ্বংসের দিক নির্দেশ করে।

শুধু এসব কারণেই অসংখ্য জীবনে ভয়ঙ্কর পরিণতি নেমে আসে, সম্পর্কের অবসান ঘটে, প্রেমের অশ্রুত নীরব সমাধি রচিত হয়। কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে সমাজে কতশত মানুষকে যে অপমান অপবাদ আর বিরহের অনলে পুড়ে ধূকেধূকে মরতে হয়- তার খবর কে রাখে! বিশ্বাস ভালোবাসা আর সততা দিয়ে পৃথিবী জয় করা যায়। স্বার্থান্ধ মানুষ কখনোই তা খতিয়ে দেখেনা।

ভুল স্বীকার না করে মিথ্যাচার করাও ভয়ঙ্কর অপরাধ! যারা এর পরিণতির শিকার হয়েছে- তারা জানে সমাজে নরক যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে কিভাবে নিয়তির নিষ্ঠুর ছোবলে তিলেতিলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে হয়। ভুল স্বীকার না করার পরিণতির চিত্র আমাদের চারপাশে দেখতে পাই। পাশাপাশি যে কারণে বা যে প্রিয় ব্যক্তিটিকে কেন্দ্র করে ভুল পথে ধাবিত হয়ে সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোকে হারাতে হয় বা যে স্বার্থের মোহে ভুল পথে পা বাড়িয়ে সংঘাত সৃষ্টি করা হয় অথবা যে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ভ‚মিকম্পের মতো সবকিছু লন্ডভন্ড করে দেওয়া হয় কিংবা যুদ্ধ বিগ্রহ বাঁধানো হয়Ñ সে সব ভুলের কোন ক্ষমা হয়না।

অনেক উদার মনের মানুষ মানবিক কারণে স্বেচ্ছায় ক্ষমা করলেও বিশ্বাসবোধের অভাব ও নৈতিক স্খলনের কারণে সন্দেহাক্রান্ত পাত্র বা পাত্রীর সাথে ক্ষতিগ্রস্ত ও বেদনাহত ব্যক্তি মানসিকভাবে আপোস করতে পারেনা। সে যতই আপন বা প্রিয়জন হোকনা কেন, সেই ব্যক্তিটি সারাজীবন অর্ন্তজ্বালায় দগ্ধ হয়ে নিজেকে বিলীন করে দিবে, তবু তাকে বর্জন করেই চলবে। স্ত্রী বা স্বামী হিসেবে, বন্ধু হিসেবে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারবেনা। আর যারা প্রত্যাখ্যাত, তাদের জীবন তো জটিল থেকে জটিলতর হয়। চাপামুখী মানুষ আর মিথ্যাচারী মানুষ বিষধর সাপের চেয়েও ভয়ঙ্কর। চাপামুখীরা শত চাপে পড়েও মুখ খুলেনা। এরা সকল ক্ষেত্রেই বিপজ্জনক। কথা চেপে রাখার কারণে নিজেদের ধ্বংস এরা নিজেরাই ডেকে আনে। আবার চাপা স্বভাবের মানুষও কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি করে। মিথ্যাবাদী মানুষ থেকে সাবধান! যেকোন মূহুর্তে এরা আপনাকে পরিস্থিতির শিকার বানাতে পারে।

শুরুতে শেষ নিয়ে ভাবতে নেই। বিন্দু থেকেই সিন্ধুযাত্রা আরম্ভ হয়। দুর্গম মরুপথ পাড়ি দিতে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। এজন্য অনেক ধৈর্য ও মনোবল এবং সৌর্য ও সাহসের প্রয়োজন হয়। আমাদের জীবনটা এমনভাবেই গঠিত। প্রাণী ও জীবের উপর প্রকৃতির প্রভাব রয়েছে। শত চেষ্টা করেও ব্যতিক্রম ঘটানো যায়না।

যদি সমীচীন হতোÑ আমরা জালিয়াতি করতে পারিনা, জবরদখল করতে পারিনা। মানবিক তাড়নায় অসৎ পন্থা অবলম্বন করে অবৈধ অর্থ বা প্রতিপত্তি অর্জন করতে পারিনা। দায়িত্বের অপব্যবহার করতে পারিনা। ধাপ্পাবাজী, চাপাবাজী করতে পারিনা। আমাদের সে শিক্ষা দেওয়া হয়নি। আমাদের মানবিক ও নৈতিক শক্তির কাছে পারমাণবিক শক্তিও তুচ্ছ বলে মনে হয়। আমরা অল্পে তুষ্ট, আমরা হালাল খাবার খাই। আমরা জীবনের স্বাভাবিক নিয়মগুলো মেনে চলি। আমরা কারো ন্যায্য অধিকারে হস্তক্ষেপ করিনা। আমরা কারো আমানত খিয়ানত করিনা। যেকোন সেবাদানকে আমরা নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করি। এমনটি হলে তো আর এ প্রসঙ্গের অবতারণা করার প্রয়োজন ছিলনা।

আমাদের মনে রাখতে হবে, মাছের পচন ধরে মাথা থেকে আর ডাটার পচন ধরে গোড়া থেকে। দুই পচনই বিপজ্জনক। বিভিন্ন অঙ্গনে মিথ্যাচার, অপপ্রচার, স্বেচ্ছাচার, জিঘাংসাপরায়নতা, শাক দিয়ে মাছ ঢাকা আর বিকৃত রুচির কর্মকান্ড আজকাল বড়বেশী পরিচালিত হয়। আপনি যত মিথ্যাচার করবেন, যত কুটকৌশলে জড়াবেন, যত বেআইনী কর্মকান্ডে অংশ নিবেন ততই আপনার লাভ। তবে ভবিষ্যৎ পরিণতির কথা ভেবে চিন্তে লাভের খেলায় জড়াবেন। শিশু তার শৈশব বুঝেনা কিন্তু পরিণত বয়সে শিশুকে দেখলে ব্যক্তির শৈশবের কথা মনে পড়ে। হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক মারা গেলে তার লাশের উপর কারো অধিকার থাকেনা। কিন্তু তার রেখে যাওয়া সম্পদের উপর স্বজনদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সব সম্পদ আটআনা ও চারআনা হিস্যায় ভাগ হয়ে যায়।

কোন কোন দেশে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের ঢোল নিজেরাই পিটায়। জুলুম নির্যাতন মিথ্যাচার আর স্বেচ্ছাচারিতার জন্য ইতিহাস তাদের কোথায় স্থান দিবে তা তারা ভাবেনা। উচ্ছিষ্টভোগীদের দিয়ে মনগড়া ফরমায়েসী লেখা লিখানো যায়; তবে সেটা ইতিহাস হয়না। ইংরেজরা তাদের দালালদের দিয়ে সিরাজদ্দৌলাহর বিরুদ্ধে অনেক মিথ্যাচার করেছে, তাতে সাময়িক ফায়দা হাসিল হলেও ইতিহাসের আস্তাকুড়ে তারাই নিক্ষিপ্ত হয়েছে। আমাদের দেশেও ইতিহাসের অনেক বিষয় নিয়ে বিতর্ক চলছে। এসব কারণে জাতির মাঝে বিভাজনও দেখা যায়। জানিনা এর শেষ কোথায়!

সরকারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ২৫৮টি কোটা আছে। দ’ুচারটি ব্যতীত সব কোটাই উপেক্ষিত। স্বজনপ্রীতি আর নিয়োগবাণিজ্যের কারণে দেশের অগনিত মেধাবী সন্তান বিদেশে পাড়ি জমিয়ে থাকে। স্কলারশীপ নিয়ে যারা বিদেশে পড়াশোনা করতে যায় তাদের অনেকেই আর দেশে ফিরে আসেনা। প্রবাসে কোটি বাঙালির অধিকাংশই উচ্চ শিক্ষিত। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বিজ্ঞানী গবেষক শিক্ষক ইত্যাদি। প্রবাস জীবন কত কষ্টের, কতযে হতাশার (!) তা বলাইবাহুল্য। স্বদেশ ভ‚মিতে প্রিয়জনদের রেখে প্রবাসে বসবাস বন্দী জীবনের মত! যেন রবীন্দ্রনাথের ‘দুই পাখি’ কবিতা। এসব মেধাবী সন্তানদের ধরে না রেখে সুযোগ্য আসনে অযোগ্য ব্যক্তিদের বসালে আর যা-ই হোক পরিণতি সুখকর হয়না। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার কৃষক শ্রমিক দুর্নীতি করেনা, ঘুষ খায়না। দেশের পাঁচ শতাংশ শিক্ষিত মানুষ দুর্নীতি করে, ঘুষ খায়’।

Character means one kind of touching stone which can make anything gold. অর্থাৎ চরিত্র হচ্ছে এক প্রকারের পরশ পাথর যার স্পর্শে যেকোন বস্তু স্বর্ণে পরিণত হয়। এমন চরিত্রবান মানুষের আজ বড় অভাব! নৈতিকতার স্খলন ঘটিয়ে মানুষ অধুনা স্বার্থের পিছনে দৌড়াচ্ছে! কত প্রকারের কুট-কৌশল খাটিয়ে যে মানুষ টাকা কামাচ্ছে! ঋণের নামে ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে! বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ফান্ডের টাকাও গায়েব হচ্ছে! প্রকল্পের টাকা লুটপাট, শেয়ার বাজার কেলেংকারী, হলমার্ক, ডেসটিনি, যুবক, পিকে হাওলাদার, ক্যাসিনো, ইভ্যালি, ধামাকা, শামীম, ফারুক, পাপিয়া- কত নাম, কত কাহিনী! আহা! এসব ভাবতে গেলে মাথা গুলিয়ে যায়!

আমি ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে সর্বহারা পিতার সন্তান। আমার পিতা শত শত মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়মিত নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছেন, খাদ্যের যোগান দিয়েছেন এবং অষুধ ও পথ্য সরবরাহ করেছেন। হানাদার পাকবাহিনী খবর পেয়ে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসের শেষ দিকে ভোররাতে আমার পিতার ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালায়। গুদামে অগ্নিসংযোগ করে সবকিছু পুড়িয়ে ভস্ম করে দেয়। তারপরও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সেবাদান অব্যাহত রেখেছেন। হায়েনারা আমার নব-পরিণিতা বোনের স্বামীকেও রাতের অন্ধকারে ধরে নিয়ে হত্যা করে। স্বাধীনতার পর আমার পিতা মুলধনের অভাবে বারবার চেষ্টা করেও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুনঃনির্মাণ ও ব্যবসা চালু করতে পারেননি! আমাদের ভবিষ্যতও অন্ধকার হয়ে যায়! স্বাধীনতার জন্য আমার পিতা সহ অসংখ্য পিতার অবদানকে রাষ্ট্র স্বীকৃতি দেয়নি; কোন প্রতিদানও দেয়নি। সারাদেশের অগনিত পিতা মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয় দান ও খাদ্যের যোগান দিয়েছিলেন বলেই মুক্তিযুদ্ধ ত্বরান্বিত হয়েছিল।

লেখক: কবি সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং সভাপতি, কবি সংঘ বাংলাদেশ।


এই বিভাগের আরো খবর

Leave a Comment